Thursday, June 8, 2017

পুঁজিবাজারের মৌল ধারণা

 
  
indexবিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসাবে পুঁজিবাজারের পরিধি ব্যাপক এবং বিস্তৃত। আমাদের সবার লক্ষ্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা করা।  যদিও একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে এ বাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জনের বিষয়টি খুব সহজ কাজ নয়। এজন্য বিনিয়োগকারীকে বিভিন্ন কলা কৌশলসহ বহুবিধ বিষয় জানতে এবং বুঝতে হয়। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জানা বা শেখার ব্যাপারে আমাদের অনাগ্রহের বেশ বড় মাপে ঘাটতি রয়েছে। আমরা না জেনে বা শিখে অনেক কিছু পেতে চাই। কিন্তু সেটা সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই আজকের আলোচনায় পুঁজিবাজারের শিক্ষনীয় মৌল বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হবে।

আপনারা সবাই জানেন- পুঁজিবাজার পুঁজিঘন এবং অত্যন্ত বুদ্ধিভিত্তিক বিনিয়োগ ক্ষেত্র। এখানে বিনিয়োগের সময় বিনিয়োগকারীকে অনেক প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হয় । বিনিয়োগ সংক্রান্ত স্বচ্ছ ও মৌলিক জ্ঞান ছাড়া  এ ব্যবসায় ভালো ফল লাভ করা যায় না। যারা দীর্ঘ মেয়াদে এখানে বিনিয়োগ করে প্রত্যাশিত মুনাফা লাভ করতে চান তাদেরকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জানতে এবং শিখতে হয়। এই শেখার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে- তিনটি ধারা খুঁজে পাওয়া যায়।


এক. ঠেকে ঠেকে শেখা :- যারা মূলত এই ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত থেকে সেবা দান করছেন তাদের সবাইকে ঠেকে ঠেকে শিখতে হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় শেখার জন্য একটু ধৈর্য্য এবং বাড়তি শ্রম প্রয়োজন হয়। যারা শিখতে পারেন তারা নিশ্চিত সুফল লাভ করেন।

দুই. ঠকে ঠকে শেখা :- আমরা যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে শিখতে চেষ্টা করছি। এই প্রক্রিয়ায় যারা শিখতে চান তাদের অনেকেই কর্ষ্টাজিত পুঁজি এবং মূল্যবান সময়ের চরম মূল্য দিয়ে শিখতে হয়। এই শেখার ফলাফল সহসা লাভ করা যায় না।

তিন. আগাম শেখা :- শিক্ষানবীশ হিসাবে জ্ঞান লাভ করা, তারা প্রথম দুই শ্রেণির তুলনায় অবশ্যই সৌভাগ্যবান। বিশেষ করে আমরা যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করিনি বা করতে ইচ্ছুক তারা অনেক বেশি অর্থ এবং সময় খরচ না করেই শিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছি।

আমরা জানি, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ধারণা, পরিশ্রম ও সর্তকতার আলোকে অভিজ্ঞাতার বিষয়টি গৌণ হয়ে যায়।(লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট এবং তিতাস গ্যাস কোম্পানি দু’টোতে সাম্প্রতিক বিনিয়োগ ফলাফল এর বড় উদাহরণ। দুটি কোম্পানিই মৌলভিত্তি সম্পন্ন। তিতাসের আয় ভালো হলেও বিশেষ কারণে এবছর তা কমেছে, আগামীতে আরো কমে যাবার আশংকা রয়েছে। অপরদিকে বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানি লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের বিক্রি এবং আয় কমেছে, ব্যয় বাড়ছে। ফলে দুটি কোম্পানির শেয়ারের দাম গত দেড়/দুই মাসে ২৫-৩০% এবং এক বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

অনেক অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী অধিক আত্মবিশ্বাসের কারণে কোম্পানির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর না নিয়ে কোম্পানি দুটিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার ফলে বড় লোকসানের শিকার হয়েছেন। আর যারা খোঁজ-খবর নিয়ে বা আগাম বুঝতে পেরে শেয়ার দুটি এক বছর বা দু’মাস আগে বিক্রি করেছেন তারা হয়েছেন লাভবান। এটাকে বলা যায় দূরদর্শীতা বা সতর্কতার ফল। তবে এটাও মনে রাখা দরকার- সাময়িক নেতিবাচক খবরে বিনিয়োগ ঝুঁকি এড়াতে ভালো মৌলের শেয়ার বিক্রি করে সে পুঁজি নতুন ভাবে কোথায় বিনিয়োগ করছেন? ডাঙায় বাঘের থাবার আক্রমন থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য পানিতে ঝাঁপ দিয়ে কুমির বা হাঙ্গরের মুখে পড়ছেন কিনা? যারা লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট এবং তিতাস গ্যাস কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে এক বছর আগে ফিন্যান্স এবং ইন্স্যুরেন্স খাতে বিনিয়োগ করেছেন তাদের অবস্থা তেমনটি হয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী তা করেননি বলা যায়।
*পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত জ্ঞান অনেকটা নবায়নযোগ্য উচ্চতর গবেষণার মতো। এটা নিয়মিত অধ্যায়ণ বা অনুশীলনের মাধমে আত্মস্থ করতে এবং সে অনুসারে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। বিনিয়োগ চোখ বুজে ঢিল ছুঁড়ে পাখি মারার মতো বিষয় নয়।

সুতরাং যারা শুরুতেই যে কোনো বিষয় ভালো ভাবে জানা এবং বোঝার সুযোগ লাভ করে, তারা অল্প সময়ে অনেক সফলতা অর্জন করতে পারেন। সে বিচারে বলতে পারি- আমাদের তুলনায় নবীনরা অবশ্যই সৌভাগ্যবান। আশা করছি- আজকের আলোচনার মাধ্যমে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা-সমস্যা এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত লাভ-লোকসানের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ভালো ভাবে জানা এবং বোঝার সুযোগ ঘটবে।
পুঁজিবাজারের গতি-প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা

পুঁজিবাজারের ব্যাপ্তি বা পরিধি যেমন ব্যাপক এবং বিস্মৃত এখনকার বিনিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ম-নীতি কর্মকান্ড তার চেয়েও  বেশি ব্যাপক, জটিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেস্ববিরোধী*। এসব বিষয় বিনিয়োগকারীর ভালো ভাবে জানা দরকার।
পুঁজিবাজারের  ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে- সার্বিক বিচারে এ বাজারে খুব কম সময় চাঙা অবস্থা বিরাজ করে। অধিকাংশ সময় বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম, লেনদেন ও মূল্য সূচক নিন্মমুখী দেখা যায়।এ সময় মাঝে মাঝে বাজারে ছোট ছোট উত্থানের ঢেউ দেখা দিলে তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগে না। এ অবস্থার প্রেক্ষিতেও বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম, আয় প্রবৃদ্ধি অনুসারে অতিমূল্যায়িত থাকতে পারে। ফলে পতনমূখী বা মন্দাক্রান্ত বাজারে অপেক্ষাকৃত কম দামের শেয়ারে বিনিয়োগ করেও সাধারণবিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারে না। বরং লোকসান গুনতে হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে।মূলত মন্দাক্রান্ত বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত কম মনে করা হলেও অজ্ঞতা বশতঃ বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারী বড় ধরনের লোকসানের শিকার হতে পারেন।বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়- চাঙা বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী অতিমূল্যায়িত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে অধিক মুনাফা অর্জন করে। চাঙা বাজারে এমন একটা সময় আসে যখন অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ, দক্ষ-অদক্ষ এবং নতুন-পুরাতনসব বিনিয়োগকারী মুনাফা করতে পারে। তখন বিনিয়োগ খুব বেশি বিচার বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হয় না। অথচ মন্দা বাজারে শেয়ারের দাম অপেক্ষাকৃত কম হলেও বিনিয়োগকারীরা খুব সাবধানী বা হিসাবী হয়।সাধারণত তারা তখন খুব বেশি ঝুঁকি নিতে চায় না। ফলে মন্দা বাজারে বিনিয়োগে মুনাফা করা কঠিন হয়ে যায়। বরং এ সময় বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী লোকসানের শিকার হয়। তবে মন্দাক্রান্ত বাজারে বিনিয়োগে মুনাফা করা যায় না একথাও সত্য নয়। দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা এ বাজার পরিস্থিতিতেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় মুনাফা করতে সক্ষম হন। আর এজন্য বিনিয়োগকারীকে বিনিয়োগের মৌলিক বিষয়গুলো এসময় ভালো করে জানতে ও বুঝতে হয়। এতে যারা যতো দক্ষতার পরিচয় দেন; বিনিয়োগে তারা ততো লাভবান হন। আর এসময়ে নতুন ভাবে পোর্টফোলিও সাজানোর সহজ সুযোগ সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে উদার এবং হিসাব নির্ভর বিনিয়োগ নীতি পরিহার করে সংরক্ষণমূলক বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ করে ধৈর্য্যরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।মন্দা বাজারে ভালো মৌলের কোম্পানির শেয়ারের দাম অনেক কম থাকে। এসময় সে সব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ভালো মুনাফা করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তাই দক্ষ বিনিয়োগকারীরা এই সময়টাকে মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের উত্তম সময় বলে মনে করেন। যারা শেয়ার বাজারের ক্রান্তিকালে বিনিয়োগ করেন, তারাই অধিক হারে সফলতা লাভ করেন। এটা পুঁজিবাজারের ইতিহাসে চিরন্তন প্রমাণিত সত্য। আমরা আশাবাদী- উপস্থিত বিনিয়োগকারীরা সম্ভাবনাময় বাজারে দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সাথে বিনিয়োগ করে সাফল্য লাভ করবেন।


* শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়লেবা অতিমূল্যায়িত শেয়ারে বিনিয়োগে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়। অথচ বিনিয়োগকারীরা তখন অধিক হারে বিনিয়োগ করে থাকে।

* মৌলভিত্তিহীন লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বভাবিক মাত্রায় বাড়ার পরও আরো দাম বাড়বে- এমন গুজব ও হুজুগে বাজারে সেসব কোম্পানির শেয়ার কেনার অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বিক্রেতা শূন্য হতে দেখা যায়।

* কোনো কারণে শেয়ারের আয় ৫/১০ শতাংশ কমেছে এমন খবরে শেয়ারের দাম ৩০/৪০ শতাংশ কমার পরও আরো কমতে পারে এমন আশংকায় বিক্রির চাপে বাজার ক্রেতা শূন্য হয়ে পড়ে।

* চাঙা বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আইনি শৈথল্য বা উদার নীতি লক্ষনীয় হয়ে ওঠে। অথচ পতনমুখি বিপর্যস্ত বাজারে কঠোর নিয়ম-নীতি আরোপ করা হয়।
পুঁজিবাজারের গতি-প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট :
 
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হলে এর গতি প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট বুঝতে হবে। গানের মতো-‘আইলাম আর গেলাম খাইলাম আর পাইলাম ভবে/দেখেলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না।’ এমন ভাবনাবুদ্ধিমানের কাজ নয়। পুঁজিবাজারে বিভিন্ন ইস্যু যেটা বা উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত বা পরিচালিত হয়। এগুলোর প্রতিটির স্তর বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র বা আলাদা এবং তাদের উদ্দেশ্য লক্ষ্য বা স্বার্থ সম্পূর্ণ আলাদা কখনো কখনো স্ববিরোধী বা সাংঘষিক। পুঁজিবাজারের গতি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে সে ধরনের চিত্র দেখা যায়।

সাধারণভাবে বলা যায়- পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ এবং অভিন্ন। তাদের সবার লক্ষ্য বিনিয়োগ করে মুনাফা করা। সে হিসাবে শেয়ারের দাম বা মূল্যসূচক বাড়লে সবার স্বার্থ সুরক্ষিত বা খুশি হবার কথা। বাস্তবে কী তা ঘটে? মোটেও না। একদল বিনিয়োগকারী যাদের হাতে শেয়ার রয়েছে দাম বাড়লে তারা খুশি বা লাভবান হয়। অন্যদিকে যাদের হাতে শেয়ার নেই বা বিক্রি করে দিয়েছে এবং নতুন করে কেনার অপেক্ষায় আছে তারা দাম কমলে বা বাজারে ধস নামলে খুশি হয়। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় স্বার্থ অভিন্ন হলেও ক্ষেত্রবিশেষে একজন বিনিয়োগকারী একে অপর জনের প্রবল প্রতিপক্ষ।শুধু বিনিয়োগকারী নয়, নানা ধরনের অনিয়ম, বিধি-বিধানের অসঙ্গতি, স্টেকহোল্ডারের স্বার্থ,পুঁজিবাজারের কারসাজি চক্র বিনিয়োগকারীর প্রতিপক্ষ। এক কথায় বলতে গেলে- বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হচ্ছে তার অজ্ঞতা এবং অতিমাত্রায় লোভ বা ভীতি। সে যদি অজ্ঞতার কারণে বাজারের গতি-প্রকৃতি অনুধাবন না করতে পারে, মৌলভিত্তি কোম্পানি এবং  সেগুলোর আয় ও লভ্যাংশ প্রাপ্তির সম্ভাব্য হার, প্রকৃত মূল্যে স্তর বা শেয়ারের দাম এবং বিশেষ করে ঝুঁকি অনুধাবন না করে লোভের বশীভূত হয়ে বিনিয়োগ করে  সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।আর যারা এই সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয় তারা আব্যাঞ্জক মুনাফা লাভ করে অব্যশই। বিনিয়োগকারীকে বুঝতে হবে পুঁজি বাজার অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ক্ষেত্র। এখানে যেমন পুঁজি বিনিয়োগে আশাব্যঞ্জক মুনাফার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি আছে লোকসানের অনাকাক্সিক্ষত আশংকা বা বহুবিদ ঝুঁকি। বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম অন্তর্নিহিত শক্তিতে যেমন আয়-ব্যয়, লাভ-লোকসান এবং সম্ভাবনাও সংকটের কারণে যতোটা বাড়ে-কমে অধিকাংশ সময় তার চেয়ে অনেকটা বেশি প্রভাবিত হয় পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে। এগুলো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট আইনি বিধি-বিধান, স্টক এক্সচেঞ্জের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্টেক হোল্ডারদের সততা, দক্ষতা, মানসিকতা, কোম্পানির ব্যবসার ধরন এবং সর্বপরি বিনিয়োগকারীদের যোগ্যতা এবং মানসিকতা এসব বিষয় ইতিবাচক না হলে বাজার ভালো হয় না। বরং এসবের প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া বাজারে প্রতিফলিত হয়। সা¤প্রতিক কালে এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব প্রেক্ষাপট। এজন্য বিনিয়োকারীকে বিনিয়োগের আগে দেশের আর্থ-সামাজিক পেক্ষাপট এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়গুলো অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে। যেমন- জাতীয় আয় ও সঞ্চয়, বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রা বাজার পরিস্থিতি, শিল্পনীতি, আমদানি-রফতানি পরিস্থিতি, ব্যাংকের সুদের হার, কলমানি রেট, বিভিন্ন স্থায়ী বিনিয়োগের রিটার্ন রেশিও এবং নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র বা খাত- সঞ্চয়পত্র, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মেয়াদী আমানত থেকে প্রাপ্ত সুদ হার প্রভৃতি বিষয় জানতে এবং বুঝতে হবে। কেননা এগুলো পুঁজিবাজারের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পৃক্ত। নিরাপদ বিনিয়োগ রিটার্ন ভালো হলে পুঁজিবাজারে ঝুঁকি গ্রহণে মানুষ সাধারণত আগ্রহী হয় না। দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার পেক্ষাপটে সুদ হার কমেছে, এটা আরো কমবে। সঞ্চয়পত্রেও উচ্চসুদ আর থাকবে না। তাছাড়া রাজনৈতিক সংকট ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি সহনশীল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।এই বিষয়গুলো পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। সুতরাং ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারের অভ্যন্তরীন সম্যসা দূর হলে এখানে বিনিয়োগ বাড়বে। আপনাদের একটা সুসংবাদ দিতে চাই-বাজার সাইকেল একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে আবর্তিত হয়। বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারের ইতিহাসে ৮, ১০, ১২ বা ১৫ বছরে সাইকেলটি সর্বনিম্ন স্তর থেকে সবোর্চ্চ সীমায় উপনীত হয়। দেশের শেয়ার বাজার ক্রান্তিকালের অনেকটা সময় অতিক্রম করেছে। অন্ধকার অমানিশার রাত কেটে সূর্য ওঠার প্রহর গুনছেন বিনিয়োগকারীরা।আমি যা বুঝি তা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চেষ্টা করবো, আমার যেখানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেক্ষেত্রে তথ্য দিয়ে আপনারা আমাকে সহযোগিতা করতে পারেন। আমরা সবাই মিলে একটি সমৃদ্ধশালী গবেষণা সেল তৈরি করতে চাই । যা বিনিয়োগে আমাদের জন্য সহায়ক হবে। ভালো কিছু অর্জন করতে হলে প্রস্তুতি এবং আয়োজন ভালো হওয়া দরকার। আপনারা চাইলে খুব দ্রুত  কোম্পানির আলোচনায় যাওয়া যাবে। কিন্তু আমি মনে করি পুঁজিবাজারের পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আগে বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে দুটি ধারা বিদ্যমান। একটি হচ্ছে মৌলভিত্তি সম্পন্ন বিনিয়োগ। যার বিভিন্ন দিকগুলো যৌক্তিকভাবে বিচার বিশ্লেষণ করা যায়। মৌলভিত্তি বিনিয়োগে সাময়িক ঝুঁকি থাকলেও এক সময় সবাই এখান থেকে মুনাফা করতে সক্ষম হয়। অপরদিকে দ্বিতীয় ধারাটি হচ্ছে গুজব ও কারসাজি নির্ভর বিনিয়োগ। এটা অনেকটা গ্যাম্বলিং এর মতো।এ বিনিয়োগের যৌক্তিক বিচার বিশ্লেষণ করার সুযোগ নেই। এখানে দু’চার জন জিতে আর বাকী সবাই হারে বা ফতুর হয়। একটি দালান যার ভিত্তি মজবুত নয়। সেটি যদি বহুতল বিশিষ্ট বানানোর চেষ্টা করা হয় এক সময় সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং দালানটি ধসে পড়ে। কারসাজি পূর্ণ বিনিয়োগের পরিনতিও হয় তদ্রুপ। একথা সত্যি মৌলভিত্তি সম্পন্ন বিনিয়োগ রিটার্ন বা মুনাফা খুব দ্রুত ক্ষেত্র বিশেষে লাভ করা যায় না। যদিও কারসাজি পূর্ণ বিনিয়োগ থেকে খুব দ্রুত অনেকটা ম্যাজিকের মতো মুনাফা লাভ করা যায়। বুঝতে ভুল হলে বা হিসাবে ভুল করলে এ ধরনের বিনিয়োগে ম্যাজিকের মতো পুঁজি এবং মুনাফা সবটাই নিঃশেষ হয়ে যায়। যদিও এটা বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি বা মানসিকতার* ব্যাপার। তারপরও মৌল ধারার বাজারে বিশ্লেষকদের অভিমত এ ধরনের বিনিয়োগ না করাই উত্তম। তাই বিনিয়োগ করার আগে পুঁজি বাজার সম্পর্কে আপনার ধারণাকে স্বচ্ছ করুন। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এ বাজারে অতিমাত্রায় লোভ এবং অকারণ ভীতি পরিহার করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত  গ্রহণের চেষ্টা করুন।

কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল এনালাইসিস

কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল বিষয়ক আলোচনা এবং টেকনিক্যাল এ্যানালাইসিস শুরুকরার আগে একটি কথা বলে নিতে চাই - যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মৌলিক নিয়ম-নীতি জেনে এবং মেনে বিনিয়োগ করতে চান; তাদের জন্যই মূলত এই আয়োজন। আর যারা কোনো নিয়ম নীতি ছাড়াই শেয়ার ব্যবসা করেন তাদের জন্য এই সব আপাতত তেমন কোনো কাজে আসবে না। তারা ব্যবসায় সাময়িকভাবে হয়তো অনেক মুনাফা করতে পারেন। কিন্তু একসময় বড় লোকসানের শিকার হবেন। তখন এসব বিষয় জানা ছাড়া ভুল সংশোধনের বিকল্প কোনো সুযোগ থাকবে না। সুতরাং একজন বিনিয়োগকারী হিসাবে মৌল বিষয়গুলো আপনাকে জানতেই হবে। যা আপনার বিনিয়োগে অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি এড়িয়ে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।

কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল এ্যানালাইসিস বা মৌলবিষয় পর্যালোচনা
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল এনালাইসিস বা মৌল বিষয় পর্যালোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা বিষদ আলোচনার দাবী রাখে। এ ক্ষুদ্র পরিসরে বিশাল এবং বিশেষায়িত জ্ঞানভিত্তিক বিষয় নিয়ে আলোচনা সহজ নয়। কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল বুঝতে হলে এর আর্থিক প্রতিবেদন জানতে বা বুঝতে হবে। ফান্ডামেন্টাল বা মৌল বিষয়ের তথ্য-উপাত্ত তাতে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এটা খানিকটা জটিল, তাই সহজে বোঝার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে বর্তমান অর্থ মন্ত্রীর এম এ মুহিতের বক্তব্য প্রাসঙ্গিক। তিনি আইসিএবি’র এক সেমিনারে বলেছেন, আমি এনুয়াল রিপোর্ট পড়তে পারি, কিন্তু ভালোভাবে বুঝি না। কারণ, এটা কীভাবে তৈরি করা হয় তা আমি জানি না। নিঃসন্দেহে এটা তাঁর অকপট সত্য ও সরলোক্তি। তার মানে এই নয় যে- আর্থিক প্রতিবেদন বুঝতে হলে সবাইকে চাটার্ড এ্যাকউন্ট্যান্ট হতে হবে। এটা বোঝার জন্য স্বচ্ছ ধারনা, জানার আগ্রহ এবং প্রচেষ্টা থাকা দরকার। সাধারণ ভাবে কোনো কোম্পানির মৌল বিষয় বলতে বুঝায় যে- অবস্থার মধ্যে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয় এবং পণ্য বা সেবা বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে। যে কোনো কোম্পানির কর্মকান্ড বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে- অনেকগুলো মৌল উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হচ্ছে :-
০১। ব্যবসার ধরন বা প্রকৃতি (Nature of Business)*এনটিসির আয় সংক্রান্ত বিষয়

০২। উদ্যোক্তা/ব্যবস্থাপকের স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা (Accountibility & Efficency of Sponsor/Management)

০৩। সম্পদ এবং সুনাম (Assets & Goodwill)

০৪। ঋণ ও দায় (Loan & Liabilities)

০৫। ইক্যুয়িটি (NAV/Shareholder Part)

০৬। পণ্য বিক্রির পরিমাণ (Turnover/Sales)

০৭। আয়-ব্যয় (Income & Expense)

০৮। কর হার ও কর অব্যাহতি (Tax Rate & Tax Holiday Facilities)

০৯। নীট আয় (Net Profit)
১০। লভ্যাংশ (Dividend)
১১। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বা ঝুঁকি (Future Prospect or Risk)

আবার এসব মৌল উপাদানের মধ্যে ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয় যুক্ত রয়েছে। সে সব বিষয় বিনিয়োগকারীকে জানতে এবং বুঝতে হয়। (যেমন- সম্পদে ফিক্সড এ্যাসেট, ফিক্সড এ্যাসেট ডিপোজিট, সাবসিডিয়ারী বা ইনভেস্টমেন্ট এবং ইনকাম প্রভৃতি)একজন বিনিয়োগকারী হিসাবে যখন বিনিয়োগ করবো তখন অবশ্যই জানা উচিত- যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছি; সেটা কোন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং কী ধরনের ব্যবসা করে? এটা কী কোনো পণ্য উৎপাদন করে, না পণ্য বিপনন করে? নাকি এটা কমিশন ভুগী এজেন্ট না অন্য কিছু? (সিমেন্ট কোম্পানির শেয়ার কিনে ট্রাক পাঠানোর গল্প)পুঁজিবাজারে বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি রয়েছে। যেগুলোর বৈশিষ্ট্য অনুসারে খাতভিত্তিক ভাগ করা হয়েছে। যেমন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, খাদ্য, প্রকৌশল, তথ্য-প্রযুক্তি, টেলিকম ও সেবা খাত প্রভৃতি। এসব কোম্পানির ব্যবসায়িক নিয়ম নীতি সংকট ও সম্ভবনা প্রভৃতি বিষয়গুলো বিনিয়োগের সময় বিবেচনা করতে হয়।

বিভিন্ন কোম্পানির রেশিও এ্যানালাইসিস

পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্রে যে ভাবে বিভিন্ন কোম্পানির রেশিও এনালাইসিস করা হয়; আমরা সে ভাবে তাত্বিক প্রক্রিয়ায় কোম্পানির রেশিও এ্যানালাইসিস করবো না। বরং বাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন খাতের কোম্পানিরগুলোর মধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাবের তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ করবো। এ থেকে আপনারা বিনিয়োগের জন্য সহায়ক তথ্য পাবেন। কোনো কোম্পানি তাদের ব্যবসার কতোটা ভালো বা খারাপ করেছে এবং ভবিষ্যতে তাদের সম্ভবনা কতোটুকু সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা পাওয়া যাবে। আশা করি- এ থেকে আপনারা উপকৃত হবেন।কোম্পানির মৌলভিত্তি এ্যানালাইসিসের ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধন, সম্পদ, পণ্য/সেবা বিক্রির পরিমাণ, পরিচালন ব্যয়, মজুদ পণ্যের পরিমাণ, পণ্য বিক্রি বাবদ পাওনা, কোম্পানির ঋণ বা দায়, অন্যান্য দায়দেনা, সুদ বাবদ ব্যয়, অতিরিক্ত আয়, করহার ও কর অব্যাহতি, নীট আয়, নীট সম্পদ, শেয়ার প্রতি আয়, লভ্যাংশ, পুঞ্জিভূত আয় প্রভৃতি বিষয়কে শতকরা হারে রূপান্তরের মাধ্যমে বের করতে হয়। প্রাপ্ত রেশিও ইতিবাচক হলে মৌলভিত্তিক কোম্পানি চেনাজানা সহজ হয়।কোনো কোম্পনিতে বিনিয়োগ করার আগে ফান্ডামেন্টাল এবং টেকনিক্যাল এনালাইসিস করার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ের রেশিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে সেগুলো হচ্ছে-

১.    মূলধন (Paid-up Capital)
২.    মোট বিক্রির পরিমাণ(Total Sales)
৩.    পণ্য বা সেবা বাবদ খরচ (Cost of Sales/Goods)
৪.    পরিচালন ব্যয় (Operating Expense)
৫.    ঋণ বাবদ ব্যয় (Finance Cost)
৬.    অন্যান্য আয়-ব্যয় (Other Income/Expense)
৭.    করপূর্ব মুনাফা (Profit Before Tax)
৮.    করহার (Tax Rate)
৯.    নীট মুনাফা (Net Income)
১০.    শেয়ার প্রতি আয় (EPS)
১১.    নেট এসেট (NAV)
১২.    আয় প্রবৃদ্ধি (Income Growth)
১৩.    লভ্যাংশ প্রদানের হার (Dividend Policy)
১৪.    কোম্পানির সর্বশেষ শেয়ার হোল্ডিং অবস্থা (Latest Share Holding Position)
১৫.    শেয়ারের দাম (Share Price)
১৬.    শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাত (Price Earning Ratio)
১৭.    লভ্যাংশ প্রাপ্তির শতকরা হার (Dividend Yield)
১৮.    রির্টান অন ইক্যুয়িটি (Return on Equity)এবং
১৯.    রির্টান অন এ্যাসেট (Return on Assets)প্রভৃতি।

0 comments:

Post a Comment